আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ না ‘অধিবাসী’ বলা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। কে আদিবাসী, কে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী; রাষ্ট্র কোনটি ব্যবহার করবে, কোনটি পাঠ্যপুস্তকে থাকবে; কোন শব্দ একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা মানবাধিকার সংগঠন ব্যবহার করতে পারবে– এসব প্রশ্ন নিয়ে উত্তাপ বাড়ছে। কিন্তু এই বিতর্ককে যদি শুধু একটি শব্দের লড়াই হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা আসল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাব। প্রশ্নটি আরও গভীর: বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে কি তার সব মানুষের সমান মর্যাদা, পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত?
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে ‘আদিবাসী’ শব্দ-সংবলিত একটি গ্রাফিতি ছিল। ওই গ্রাফিতিতে একটি গাছের পাঁচটি পাতায় ‘মুসলিম’, ‘হিন্দু’, ‘বৌদ্ধ’, ‘খ্রিষ্টান’ ও ‘আদিবাসী’ লেখা ছিল এবং পাশে ছিল– ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। একটি ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের পর ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনা বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করে। পরে শব্দটি পুনর্বহালের দাবি করেন আদিবাসী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীরা। সে বছর জানুয়ারিতে সংঘর্ষে অনেকে আহত হন। পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদের একটি শব্দ তখন পরিচয়, ইতিহাস, রাষ্ট্র ও নাগরিকত্বের বড় প্রশ্নে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, একটি শব্দ এত ভয় তৈরি করে কেন?
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা যেমন তার স্বাভাবিক দায়িত্ব, তেমনি তার সীমানার ভেতরে বসবাসকারী ভিন্ন জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের পরিচয় ও অধিকার রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এ দুটি দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বিভিন্ন ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের’ স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনেও ‘আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও আইনগত পরিসরে অপরিচিত নয়।
আন্তর্জাতিক অধিকার কাঠামোও বিষয়কে কেবল নামের প্রশ্ন হিসেবে দেখে না। জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রে পরিচয়, সংস্কৃতি, ভূমি, প্রথাগত জীবন ব্যবস্থা, অংশগ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘোষণাপত্রের ৪৬ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয়েছে– এর কোনো কিছুই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে দেওয়ার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অতএব ‘আদিবাসী স্বীকৃতি মানেই আলাদা রাষ্ট্র’– এমন ধারণা আন্তর্জাতিক কাঠামোকেও অতিসরলীকৃত করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠী-বিষয়ক কনভেনশন, ১৯৫৭ বা আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করে, যা এখনও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলবৎ। ২০০৯ সালে আইএলও বাংলাদেশের আইন ও কনভেনশন ১০৭-এর মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনাও প্রকাশ করে। এমনকি ২০২৫ সালে গৃহীত এবং ২০২৬ সালে প্রকাশিত আইএলওর বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যবেক্ষণেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি মন্তব্য রয়েছে। অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বিষয় নয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কাঠামোর মধ্যে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে স্বীকার করেছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, আঞ্চলিক পরিষদ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ ভূমিকার ব্যবস্থা দেখিয়ে দেয়– রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রেখেও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ অধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাহলে আপত্তি কোথায়? সম্ভবত শব্দে নয়; ক্ষমতায়।
‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বললে আলোচনাটি সহজেই সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের প্রশাসনিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ বললে সামনে আসে আরও কঠিন প্রশ্ন– ভূমির সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্বীকৃতি কী হবে। প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থার মর্যাদা কোথায়? উন্নয়ন প্রকল্পের আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে? প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে তাদের অংশগ্রহণ কী হবে? রাষ্ট্রের উন্নয়ন কি তাদের জন্য, নাকি তাদের ওপর? এই প্রশ্নগুলোই শব্দটিকে রাজনৈতিক করে তোলে। কিন্তু রাজনৈতিক হওয়া অপরাধ নয়। গণতন্ত্রে ক্ষমতা, সম্পদ, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। তাই ‘কেন তাদের আদিবাসী বলা হচ্ছে’– এটি না হয়ে আজকের প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘কেন তাদের অধিকার নিশ্চিত করার আলোচনায় একটি শব্দ এত বড় ভয় তৈরি করছে?’
একজন চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, খাসি বা ম্রো একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের অধিকারী হতে পারেন। নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করে; জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ধারণ করে মানুষের সামাজিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্ব। এক পরিচয় অন্য পরিচয়কে বাতিল করে না।
এখানেই আরেকটি ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি। ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি মানেই দেশের সব জমির মালিকানা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে– এমন সরল সমীকরণ আন্তর্জাতিক অধিকার কাঠামোতেও নেই। আবার শব্দটি ব্যবহার না করলেই ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, বৈষম্য বা ঐতিহাসিক বঞ্চনার সমস্যাও অদৃশ্য হয়ে যায় না। আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিউনিটি, জাতিসংঘ সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সংগঠনগুলোর অবস্থানও বোঝা জরুরি। তারা সাধারণত কোনো নতুন পরিচয় তৈরি করে না; বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থায় প্রচলিত একটি ধারণা ব্যবহার করে। সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শুধু উন্নয়নের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, অধিকারভোগী হিসেবে দেখা হয়।
২০২৫ সালের পাঠ্যপুস্তক বিতর্কটি আমাদের আরেকটি বাস্তবতা দেখিয়েছে– পরিচয়ের প্রশ্ন এখন আর পাহাড় বা প্রান্তিক অঞ্চলের বিষয় নয়; এটি জাতীয় সাংস্কৃতিক বয়ানের অংশ। গণমাধ্যমেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংস্কৃতি ও সংঘাতের খবর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থাকে। ফলে পরিচয় নিয়ে বিতর্ক যতটা দৃশ্যমান, অধিকার নিয়ে আলোচনা ততটা নয়। বাংলাদেশ চাইলে এই বিতর্ককে শব্দের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার লড়াই না বানিয়ে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির আলোচনায় নিতে পারে। আমাদের প্রয়োজন এক রাষ্ট্র, এক নাগরিকত্ব, এক সার্বভৌমত্ব; কিন্তু এক রকম মানুষ নয়।
বুঝতে হবে, রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অভিন্নতা তৈরিতে নয়, বৈচিত্র্যকে নিরাপদে ধারণ করার সক্ষমতায়ও। কোনো জনগোষ্ঠীর নিজের পরিচয় উচ্চারণের অধিকারকে ভয় পাওয়ার বদলে রাষ্ট্র যদি তাদের মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমির অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হবে না, বরং আরও ন্যায়ভিত্তিক, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক হবে। তাই ‘তাদের কী নামে ডাকব’– এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়। প্রশ্ন হতে হবে, রাষ্ট্র তাদের কীভাবে দেখবে?
ফারাহ্ কবির: কান্ট্রি ডিরেক্টর,
একশনএইড বাংলাদেশ পড়ুনঃ সমকাল



